Tanvir Shahriar Rimon

Share on facebook
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email

যে সিএনজিতে চড়তে চাইনি আমি সেই সিএনজি চালক জাহাঙ্গীর ভাই কতকিছু শিখালেন !

1+

বৃষ্টির মাঝে প্রকৃতি দেখার আলাদা একটা মজা আছে যেমন আনন্দ আছে পাহাড় চূড়ায় বসে মেঘ দেখার, মিহি তুলার মতো মেঘ উড়ে উড়ে চলে, হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলে মিইয়ে যায় -ভীষণ মজার খেলা ! শুক্রবার দুপুরে রিসোর্টে ঢুকেই আমার স্ত্রী সন্তানরা যখন ওয়াও বলল, বুলবুল সাহেবের (টর্নেডো) চোখ রাঙানী  উপেক্ষা করে বান্দরবান আসার সার্থকতা খুঁজে পেলাম ।

শনিবার সকালে ব্রেকফাস্ট শেষে আমার স্ত্রী বলল, চলো, নীলগিরি ঘুরে আসি !

-নীলগিরি ! এই ঝড় ঝাপটার মাঝে ? চোখ উল্টে বললাম ।

-হ্যাঁ, সমস্যা কোথায় ? আমি অলরেডি একটা গাড়ীর সাথে কথা বলছি । জিপ গাড়ী । আপডাউন সাড়ে চারহাজার টাকা নেবে ।

-সাড়ে চারহাজার টাকা ? ২১ কিলোমিটার যাব আবার আসব তাতে এতো টাকা ! দাঁড়াও আমি ঠিক করছি ।

একজন বেলবয়কে সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই ফ্যামিলি নিয়ে নীলগিরি যাব, একটা গাড়ী ঠিক করে দাও ।

-স্যার সমস্যা নাই, জাহাঙ্গীর ভাই নিয়া যাবে । খুব ভালো ড্রাইভার । মাহিন্দ্র চালায় ।

-তা কত নেবে ?

বেলবয় সাথে সাথে মোবাইলে ফোন করল জাহাঙ্গীর ভাইকে । কথাবার্তা বলে বলল, স্যার আপডাউন আড়াই হাজার টাকা নিব । খুব ভালো ড্রাইভার স্যার !

আমি খুশি হয়ে গেলাম । বউকে বল্লাম দেখছ, ২ হাজার টাকা সেভ করছি । তোমাকে তো ঠকাই দিছিল !

যাই হোক দুপুরে লাঞ্চ করে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রিসোর্ট থেকে বের হয়ে আমি মাহিন্দ্রা জিপ খুঁজতে লাগলাম । কিন্তু কোথাও পেলামনা । এমন সময় সেই বেলবয় এগিয়ে এসে বলল, স্যার এই যে আপনাদের গাড়ী রেডি । উঠে পড়েন জলদি । 

আমি তো ভড়কে গেলাম । আরে এটা তো সিএনজি ? তুমি না মাহিন্দ্রা ঠিক করেছ ! 

-স্যার এটাই তো মাহিন্দ্রা । মাহিন্দ্রা সিএনজি । এক্কেবারে পঙ্কিরাজের মতো চলে । আর জাহাঙ্গীর ভাই সেই রকম এক পাইলট । উড়াই নিয়া যাবে আপনাদের । 

এমনিতেই আঁকাবাঁকা পথ । তারউপর জিপের জায়গায় সিএনজি ! আমি বেকে বসলাম-আরে না , সিএনজিতে আমি যাবনা । প্রোগ্রাম কেনসেল ।

এমন সময় জাহাঙ্গীর ভাই হাসি মুখে এগিয়ে আসলেন-স্যার, আপনি উঠেন । ভয় পাইয়েন না স্যার । এই মনে করেন সবকয়টা বাঁক আমার মনে করেন যে মুখস্থ । আপনি আসার পর বলবেন, আমি কেমন চালাই !

আমার স্ত্রী একটু ব্যঙ্গাতক চাহনি দিয়ে বলল, ছাগলের দাম দিয়ে কী আর গরু কেনা যায় । চলো চলো, পরে অন্ধকার হয়ে গেলে কিছু দেখা যাবেনা ।

সে বাচ্চাদের নিয়ে মাহিন্দ্রায় উঠে বসল ।

আমিও আমতা আমতা করে উঠলাম ।

জাহাঙ্গীর ভাই গাড়ীর স্টার্ট দিলেন । বৃষ্টির মাঝে পিচ্ছিল পথ । বেশ সাবধানে তিনি চালাতে লাগলেন ।

কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার ডান পাশে দেখলাম একটা সিএনজি দাঁড়িয়ে আছে ।

জাহাঙ্গীর ভাই ওই ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলেন, কী অইয়েদে ? থিয়াই কা রইয়ুছ ?

-ব্যাডা, গিয়ারর তার ছিঁড়ি গিয়্যে …

এবার জাহাঙ্গীর ভাই আমাদের গাড়িটি সাইট করে নিজে তার কাছ থেকে তার বের করে বললেন, ধর, ইবা লাগাইয়েরে তাড়াতাড়ি যও গই …

এভাবে আরো কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম একটা চাঁন্দের গাড়ী,  রাস্তার একটা গর্তের মধ্যে গাড়ীর একটা চাকা পড়ে গেছে । জাহাঙ্গীর ভাই বললেন, স্যার দুইটা মিনিট দেন, আসতেছি স্যার ।

তিনি দৌড়ে গিয়ে চাঁন্দের গাড়ীর চাকা তুলতে কাজে লেগে গেলেন । একটা বাঁশ নিয়ে এসে চাকার নিচে দিতেই দেখলাম গাড়ীটা গর্ত থেকে বের হয়ে গেছে ।

আমি মুগ্ধ হয়ে দেখলাম তার কাজ । তিনি এসে বললেন, সরি স্যার, একটু দেরী হয়ে গেল ।

-আমি স্মিত হেসে বললাম, না না ঠিক আছে ভাই ।

নীলগিরির কাছাকাছি পৌছে যাচ্ছি এমন সময় দেখলাম একটা ট্রাক এমন ভাবে রাস্তার পাশে পার্ক করেছে যে রীতিমতো দুদিক থেকে জ্যাম লেগে গেছে । কিন্তু আমার কেন জানি মনে হলো, এই সমস্যাও বেশিক্ষণ থাকবেনা ।

ঠিকই জাহাঙ্গীর ভাই নেমে গেলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট এর ভুমিকায় । প্রায় দশমিনিটে তার দারুণ দক্ষতায় দেখলাম রাস্তা ক্লিয়ার হয়ে গেছে ।

আমরা নীলগিরি পৌছে সেখানে ঘন্টাখানেক সময় কাটিয়ে যখন ফিরব তখন রীতিমতো অন্ধকার হয়ে গেছে । তার মাঝে শুরু হয়েছে দমকা বাতাস সহ বৃষ্টি । আমরা মাহিন্দ্রায় চেপে ফিরছি রিসোর্টে । কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম মেঘ ভাসছে রাস্তায়, দুচারহাত দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছেনা । কিন্তু আমার কোনো ভয় কাজ করছেনা । এই পরোপকারী জাহাঙ্গীর ভাইয়ের উপর আমার কেন জানি দারুণ বিশ্বাস তৈরি হয়েছে । যিনি বিনা স্বার্থে আসার পথে এতো গুলো মানুষের উপকার করেছেন তিনি আমাদের কোনো বিপদে ফেলবেন না সে আমি নিশ্চিত । আমি চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির শব্দ উপভোগ করতে করতে একসময় রিসোর্টে এসে পৌছি ।

গাড়ী থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে তাকে বাড়তি কিছু টিপস দিই । তিনি বলেন, স্যার বাড়তি টাকা দিলেন কেন ?

আমি হেসে বলি, জাহাঙ্গীর ভাই , আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে । শুধু বান্দরবানে নয়, আমার ধারনা পুরো পৃথিবীতে আপনার মতে পরোপকারী মানুষ বড় বিরল ! আপনি যেভাবে মানুষকে যেচে পড়ে সাহায্য করেন , এই জিনিসটা কখনো ছাড়বেননা । আপনার কাছ থেকে আজ অনেক কিছু শিখেছি আমি । জীবনে কাজে লাগাতে চেষ্টা করব ।

আমি তাকে অনুরোধ করি-ভাই আপনার একটা ছবি তুলতে চাই ! কোনো অসুবিধা আছে ?

লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গী তে না স্যার বলেই তিনি পকেট থেকে চিরুনী বের করে চুলের সিথি ঠিক করলেন তারপর অন্ধকারের মাঝে একজনকে বললেন মোবাইল টর্চ লাইট থেকে আলো ফেলতে তার মুখে ।

সেই লোক এসে আলোফেললেন, আমি অসম্ভব পরোপকারী এক সুখী মানুষের উজ্জ্বল মুখ দেখতে পেলাম । আমার মোবাইল ক্যামেরায় তার সেই ছবি তুলে তার সাথে হাত মেলালাম ।

আমার কেন জানি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো, এই বান্দরবানের পাহাড়ী আঁকা বাঁকা পথে গাড়ী চালাতে কোনো চালক ভয় পায়না । তারা জানে কোনো সমস্যা হলে, পথে কোনো বিপদ হলে সেখানে ঠিকই হাজির হয়ে যাবেন জাহাঙ্গীর ভাই । মাহিন্দ্রা থামিয়ে জিজ্ঞেস করবেন

-ওডা কী অইয়েদে ? থিয়াই কা রইয়ুছ ? 

-ব্যাডা, গিয়ারর তার ছিঁড়ি গিয়্যে …

জাহাঙ্গীর ভাই তার গাড়িটি সাইট করে গিয়ারের তার বের করে বলবেন, ধর, ইবা লাগাইয়েরে তাড়াতাড়ি যও গই …

আমি চলে যাচ্ছি । হঠাৎ পেছন থেকে জাহাঙ্গীর ভাই আমাকে ডাক দিলেন ।

স্যার, আপনাকে একটা কথা বলব যে …

-বলেন বলেন ভাই

-স্যার আপনার আর আপনার পরিবারের জন্য অনেক দোয়া স্যার । আমাকে তো সবাই তুমি-তামি করে, আপনি স্যার আমাকে ভাই ডাকছেন, আপনি বলছেন । আমি স্যার খুব খুশি স্যার…!

বৃষ্টির ঝাপটাটা ততক্ষনে থেমে গেছে । আকাশে একদল মেঘ পূব থেকে পশ্চিমে দৌড়ে যাচ্ছে । আমি মেঘের পেছন পেছন হাটতে থাকি । মেঘের দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে আমার । যে সিএনজিতে চড়তে চাইনি আমি সেই সিএনজি চালক জাহাঙ্গীর ভাই কতকিছু শিখালেন আমাকে…!

পুনশ্চ : কেউ বান্দরবান থেকে কোথাও বেড়াতে যেতে চাইলে চোখ বন্ধ করে জাহাঙ্গীর ভাইকে কল করতে পারেন । তিনি তার পঙ্কীরাজে করে আপনাদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌছে দেবেন । যাওয়া আসার পথে হয়ত অনেক অমূল্য কিছু শিখাবেন । হয়ত বদলে দেবেন জীবন সম্পর্কে আপনার আমার ধারণা ।

জাহাঙ্গীর ভাই -01868172408

Leave a Reply