Tanvir Shahriar Rimon

Share on facebook
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email

ডাক্তারদের উপর মানুষের এই বিশ্বাসটা সংক্রামকের মতো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে !

1+

এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার এমন হলো তার ! প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট !! এই অবস্থাটা বর্ণনা করার মতো না ।

এপ্রিলের ১ তারিখ এরকম হয়েছিল । জীবনে প্রথম তাকে এমন কষ্টকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে দেখেছিলাম । সেদিন ভয়ও পেয়েছিলাম । তবে আজকের বিষয়টা আরো কঠিন ।

সেহরী খাওয়া শেষ হলে আমার স্ত্রী বাথরুমে যায় ব্রাশ করার জন্য । আমি ফজরের নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম । হঠাৎ দেখি যে খুব জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বাথরুম থেকে বের হয়ে প্রেসার মাপার ডিজিটাল মেশিনটা বের করল । মেশিন যে রিডিং দিলো তাতে দেখা গেল ১০০-১৩৫ ! আবার মাপতে বললাম, ফলাফল একই ।

সে বিছানায় শুয়ে পড়ল । আমি এই ফাকে নামাজ পড়ে নিলাম । নামাজ শেষ হতেই সে বলল, খুব বমিটিং হচ্ছে । শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । বুক ধরে আছে ।

আমি তাকে ধরে ব্যাসিনের কাছে নিয়ে গেলাম । বমি হলো । ভাবলাম হয়ত গ্যাস্টিকের সমস্যা থেকেই এমনটা হয়েছে । হয়ত এবার সেরে যাবে । কিন্তু না , অবস্থার কোনো উন্নতি দেখলাম না ।

মাথা ঠিক মতো কাজ করছিলনা । বললাম, চলো হসপিটালে যাই ।
-মাথা খারাপ, কিছু হলে বাচ্চাদের আমার মুখ পর্যন্ত দেখতে দেবেনা । সে অনেকটা চেচিয়ে উঠল !

আব্বা ততক্ষনে ঘুমিয়ে গেছেন । আব্বাকে ডাকব কিনা ভাবছিলাম । দুবার দরজার কাছ থেকে ঘুরে এসেছি । ডাকিনি ।

এর মাঝে রুমের দক্ষিনের জানালাটা খুলে দিলাম । হাল্কা হাল্কা বাতাস আসছিল । সে আমাকে বলল, পর্দাটা একপাশে টেনে দাও । আমি পর্দাটা টেনে দিলাম । ততক্ষনে সূর্য উঠে গেছে ।

আমি তাকে বললাম, একটু জোরে জোরে নাক দিয়ে শ্বাস নাও । আর মুখ দিয়ে ছাড়ার চেষ্টা করো । সে তাই করল । আমাকে বলল, পারলে এক টুকরা আদা নিয়ে আসো । আদা খেলে ভালো লাগবে । আমি নিয়ে আসলাম । সে মুখে দিয়ে চাবাল কিছুক্ষন ।

আমি বিছানায় তাকে ঘুমানোর চেষ্টা করতে বললাম । সে আমাকে বলল
-আমার কিছু হয়ে গেলে বাচ্চা গুলোর খেয়াল রেখো ।
আমি পাঁজর ভাঙ্গার শব্দ পেলাম ! তবু মনকে শক্ত করে বললাম, যা তা বলবানা । কি এমন হইছে যে এমন উল্টাপাল্টা কথা বলছ !
-উল্টাপাল্টা না , আমার সত্যি সত্যি খারাপ লাগছে ।
আমি তার কপালে হাত রেখে বললাম, আমরা তো ভেজালে ভরপুর মানুষ , তোমার মতো হান্ডেড পারসেন্ট পিওর মানুষদের এই দুনিয়ায় বেশি দরকার । তোমার কিচ্ছু হবেনা । তুমি একটু রেস্ট নাও । ঘুমালে ভালো লাগবে ।

আনুমানিক ৬ টার দিকে সে ঘুমিয়ে পড়ল । আমি কিছুক্ষণ ঘরময় পায়চারি করলাম । তার ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে খুব অসহায় লাগছিল ।
কী অদ্ভুত এক ট্রেনের যাত্রী আমরা । প্রত্যকের সিগন্যাল ডাউনলোড করা । অথচ আমরা কেউ সেই সিগন্যাল সম্পর্কে জানিনা । যে ট্রেনে চেপেছি বড় অনিশ্চিত এক ট্রেন । আমি আপনি ভাবছি ইন্টারসিটি ট্রেন-বিরতীহীন ছুটে চলবে । অথচ ট্রেনের চেইনে হঠাৎ টান পড়বে । টিটি এসে বলবেন, আপনি গন্তব্যে এসে গেছেন । আপনার টিকিট এই স্টেশন পর্যন্তই ! এবং তখনই নেমে যেতে হবে অনিশ্চিত কিন্তু অমোঘ এক গন্তব্যের পানে । সেই স্টেশনে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত চেনা জন্ম আর অচেনা মৃত্যুর মাঝামাঝিই আমাদের অবস্থান ।

এসব ভাবতে ভাবতেই আমি ওর পাশে এসে বসি । বালিশ টেনে ঘুমানোর চেষ্টা করি । ঘুমতো আসতে চায়না । নানা চিন্তা ঘুরতে থাকে মাথায় ।

এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি । ঘুম থেকে জেগে ওর কপালে হাত দিই । না, আল্লাহর রহমতে জ্বরটর নেই । ওর ঘুম ভাঙ্গার প্রতীক্ষায় থাকি ।

সে ঘুম থেকে জাগতেই জিজ্ঞেস করি-কেমন লাগছে এখন ?
-মোটামুটি ভালো । শ্বাস কষ্টটা নেই ।
-আলহামদুলিল্লাহ । তবু চলো, একটা ইসিজি করিয়ে আসি ।

আমি ইপিক হসপিটালের ডা: নাদিম ভাইকে ফোন দিলাম । উনি ফোন ধরলেন না । তারপর ডা: জুয়েল ভাইকে ফোন দিলাম । জুয়েল ভাই ফোন ধরলেন ।
উনাকে বিস্তারিত বললাম । উনি বললেন, প্রেসারটা স্টেবল না । আমাকে কিছু মেডিসিন টেক্সট করে পাঠালেন ।
কিছুক্ষন পর নাদিম ভাই ফোন দিলেন । উনাকে বললাম যে ভাই ইসিজি করাতে চাচ্ছি আপনার ভাবীর ।
উনি বিস্তারিত শুনে বললেন , এখনই নিয়ে চলে আসেন ।

আমি জোহরের নামাজ পড়ে আমার স্ত্রীকে বললাম তৈরী হয়ে নাও । এর মাঝেই লক্ষ্য করলাম তার মনটা খারাপ !
-কী মন খারাপ করে আছো কেন ? শরীর খারাপ লাগছে আবার ?
-মন খারাপ করছি রোজাটা রাখতে পারছিনা এজন্য ।
-কী যে বলো, তুমি অসুস্থ মানুষ । তোমার জন্য রোজা ফরজ না । ইসলামে কারো সাধ্যের অধিক কোনো কিছু চাপানো হয়নি । আল্লাহ সুরা বাকারায় একথা স্পষ্ট বলেছেন । আর এই রোজাটা তুমি পরে রাখতে পারবে ।
আমার কথা শুনে সে কিছুটা স্বস্তি পেল ।

এর মাঝে নাদিম ভাই দুবার ফোন দিলেন আমাদের দেরি দেখে । যাইহোক আনুমানিক পোনে দুটার দিকে আমরা ইপিক হসপিটালে পৌঁছলাম । নাদিম ভাই ইসিজির সাথে চেস্ট এক্সরে করে ফেলতে বললেন । আমরা তাই করলাম । নাদিম ভাই কার্ডিওলজিস্ট ডা. সন্দিপন দাশের সঙ্গে ফোনে কথা বললেন । এবং আমাদের আস্বস্থ করলেন যে উনি সাড়ে তিনটার দিকে ইপিকে আসবেন এবং আমার স্ত্রীকে দেখবেন ।

এর মাঝে রিপোর্ট চলে আসল । ডাক্তার ইসিজি রিপোর্ট দেখে বললেন কোনো সমস্যা নেই । এক্সরে রিপোর্টও ভালো । তবে প্রেসার আনস্টেবল । তিনি কিছু ওষুধ লিখলেন । এবং আরো কিছু টেস্ট করতে বললেন ।

আমি পকেট থেকে উনার ভিজিট বের করে দিতে চাইলে উনি নিলেন না । আমি অনেক অনুরোধ করেও দিতে পারলাম না ।

যারা বলেন যে শ্বাসকষ্ট শুনলে ডাক্তাররা রোগীদের করোনা টেস্ট করতে বলেন, সেই কথাটার কোনো সত্যতা অন্তত আমরা পেলাম না । বরং ডা: নাদিম এবং ডা: সন্দিপনের যে চমৎকার সৌজ্যনতা এবং সহযোগিতা পেলাম তা সবসময় মনে থাকবে ।

আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, কী, তুমি তো হাসপাতালে আসতেই চাইছিলেনা !
সে এবার একটু হাসল ! এই হাসিতে সাহস আছে আর আছে ডাক্তারদের উপর বিশ্বাস !

ওষুধ কিনে গাড়ী স্টার্ট দিতে দিতে বলি-ডাক্তারদের উপর মানুষের এই বিশ্বাসটা সংক্রামকের মতো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে !

Leave a Reply